ঢাকা, শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২

নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কে উত্তপ্ত রাজনীতি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগাম উত্তাপ

আহমেদ শাহেদ

 প্রকাশিত: আগস্ট ২৬, ২০২৫, ০৯:২৬ সকাল  

ছবি: সংগৃহিত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতি আবারও উত্তেজনায় টগবগ করছে। নির্বাচন কমিশন এখনো ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করেনি, তবুও সারা দেশে নির্বাচনী সাড়া লেগেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নানা কর্মসূচিতে মাঠ সরগরম করে তুলেছে। কোথাও পদযাত্রা, কোথাও মিছিল কিংবা প্রচার-সমাবেশ- সব মিলিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা নির্বাচনী প্রস্তুতি আর সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে একইসঙ্গে সামনে এগিয়ে নিচ্ছেন।

তবে বিএনপির এই সরব নির্বাচনী কর্মসূচির পেছনে আরেকটি বড় বিতর্ক সমানতালে জোরালো হয়ে উঠেছে। তা হলো, নির্বাচনে কোন পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে। নির্বাচন কমিশন এখনো দিনক্ষণ নির্ধারণ না করলেও ভোটের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মতবিরোধ প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সংখ্যানুপাতিক বা প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতি নিয়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ছোট ও নবগঠিত কয়েকটি রাজনৈতিক দল দৃঢ়ভাবে বলছে, জাতীয় নির্বাচনসহ সব ধরনের ভোটই এই পদ্ধতিতে হওয়া উচিত। তাদের দাবি, এতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জনসমর্থনের অনুপাতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে এবং ছোট দলগুলোও জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা পাবে।

অন্যদিকে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রস্তাবের বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিএনপিসহ কয়েকটি দল প্রকাশ্যে জানিয়েছে, পিআর পদ্ধতি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে না বরং দুর্বল করবে। তাদের মতে, প্রত্যক্ষ ভোটপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণ যে প্রতিনিধি নির্বাচন করে সংসদে পাঠান, সেটাই প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রতিফলন। পিআর পদ্ধতিতে ভোটারের মতামত সরাসরি প্রতিফলিত না হয়ে দলভিত্তিক আনুপাতিক হিসেবে সংসদ আসন বণ্টিত হয়, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ক্ষতিকর। একইসঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার শঙ্কাও তারা দেখছেন।

এই মতবিরোধ শুধু পদ্ধতিগত তর্কেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্বও আরও প্রকট হচ্ছে। নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পিআর পদ্ধতির পক্ষে সরব হলেও বিএনপিসহ প্রধানধারার দলগুলো প্রচলিত নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই একমাত্র কার্যকর বলে মনে করছে। ফলে একদিকে বড় দলগুলোর মধ্যে ঐক্য থাকলেও অন্যদিকে ছোট দলগুলোর মধ্যে পিআর পদ্ধতির দাবি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধ ভবিষ্যৎ ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বড় দলগুলো যেহেতু প্রত্যক্ষ ভোটে জনসমর্থন অর্জনে আত্মবিশ্বাসী, তারা প্রচলিত ব্যবস্থার পক্ষেই থাকতে চায়। অন্যদিকে ছোট দলগুলো সংসদে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পিআর পদ্ধতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

সব বিতর্ক ও মতপার্থক্যের মাঝেও বিএনপি তাদের নির্বাচনী কর্মসূচি থামায়নি। দলীয় নেতারা মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই জনগণকে সক্রিয় রাখা জরুরি। সেই লক্ষ্যেই তারা মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের সামনে সরকারের সমালোচনা যেমন তুলে ধরা হচ্ছে, তেমনি ভোটারদের আস্থাও কুড়ানোর চেষ্টা চলছে।

এখন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই হবে মূল নির্ধারক। প্রচলিত ব্যবস্থায় নির্বাচন হবে নাকি পিআর পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার কোনো অগ্রগতি হবে- তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক যত বাড়ছে, ততই দেশের রাজনৈতিক আবহ আরও গরম হয়ে উঠছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই উত্তাপ কমার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাধারা/এসআর