ঢাকা, শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২

বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

পুরোনো দ্বন্দ্বে নতুন উত্তাপ, দশম গ্রেড নিয়েই মূল সঙ্কট

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৫, ১১:০৫ দুপুর  

ফাইল ছবি

দেশের প্রকৌশল শিক্ষার অঙ্গনে আবারও জেগে উঠেছে পুরোনো এক দ্বন্দ্ব। মূল সঙ্কট ঘুরপাক খাচ্ছে সরকারি চাকরির দশম গ্রেডকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে এই পদে কেবল ডিপ্লোমাধারীরা আবেদন করতে পারছেন, অথচ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি করা শিক্ষার্থীদের জন্য তা বন্ধ। এ কারণেই আন্দোলনে নেমেছেন বিএসসি শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে ডিপ্লোমাধারীরা বলছেন, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কথা বিবেচনা করে এই পদ তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা জরুরি।

এই দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ২০১৩ সালেও একই ইস্যুতে উভয় পক্ষ রাস্তায় নেমেছিল, তবে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এবার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গত সপ্তাহে শাহবাগে পুলিশের লাঠিচার্জের পর। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেন, যা এখনো চলছে। ক্যাম্পাসগুলো কার্যত শাটডাউন অবস্থায় রয়েছে।

বিএসসি শিক্ষার্থীদের দাবি, চাকরির বাজারে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর তারা নবম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দিতে পারেন, কিন্তু দশম গ্রেডের অসংখ্য পদ তাদের জন্য বন্ধ। অন্যদিকে ডিপ্লোমাধারীরা পলিটেকনিক থেকে পড়াশোনা শেষ করে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দশম গ্রেডে যোগ দেন এবং দীর্ঘ চাকরি জীবনে এক বা দুইবার পদোন্নতির সুযোগ পান। তাদের যুক্তি, দেশে প্রায় কুড়ি লাখ ডিপ্লোমাধারী রয়েছে, অথচ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সীমিত। বিএসসি ডিগ্রিধারীদের জন্য নবম গ্রেড উন্মুক্ত থাকলেও ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সুযোগ বলতে এই দশম গ্রেডই। ফলে এটি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া অন্যায্য হবে।

গত ২৫ আগস্ট রংপুরে নেসকোতে এক বিএসসি ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সূচনা হয়। এর পরেই ঢাকায় বুয়েট শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন এবং অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেন। বিএসসি শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি তুলে ধরেন, যার মূল বিষয় হলো দশম গ্রেডের পদ সবার জন্য উন্মুক্ত করা। ডিপ্লোমাধারীরা পাল্টা সাত দফা দাবি পেশ করে আন্দোলনে সক্রিয় হন।

সংকট নিরসনে সরকার দ্রুত উদ্যোগ নেয়। প্রথমে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সেই কমিটির বৈঠকে ঘোষণা আসে একটি ১৪ সদস্যের ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের। এই গ্রুপে থাকবে জনপ্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরের প্রধান, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি এবং ডিপ্লোমাধারীদের চারজন প্রতিনিধি। এক মাসের মধ্যে সুপারিশ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ওয়ার্কিং গ্রুপ ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

কমিটির সভাপতি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, উভয় পক্ষের দাবি ও বক্তব্য শুনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, এই সমস্যার শেকড় অনেক পুরোনো, তাই সমাধান খুঁজতে সবার মতামত প্রয়োজন। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা আন্দোলনে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করেন।

তবে বাস্তবতা হলো, কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়। বিএসসি শিক্ষার্থীদের দাবি, নিয়োগ ও পদোন্নতি হতে হবে মেধাভিত্তিক, কোটা নয়। অপরদিকে ডিপ্লোমাধারীরা বলছেন, তাদের দীর্ঘ চাকরিজীবনে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত, তাই তাদের জন্য দশম গ্রেড সংরক্ষিত থাকাটাই ন্যায্য। উভয় পক্ষের অবস্থান অনড় থাকায় সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


বাংলাধারা/এসআর