ঢাকা, রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ওয়াশিংটন-তেহরান উত্তেজনা বাড়লে মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হবে: কাতার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ১৪, ২০২৬, ১১:৩১ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে- এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে কাতার। উপসাগরীয় এই দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তাহলে এর প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং আশপাশের অঞ্চলগুলোও ভয়াবহ অস্থিরতার মধ্যে পড়ে যাবে।

গতকাল রাজধানী দোহায় কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো ধরনের উত্তেজনাবৃদ্ধি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ কারণেই কাতার পরিস্থিতি শান্ত রাখার পক্ষে এবং যতটা সম্ভব সংঘাত এড়িয়ে চলার ওপর জোর দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

কাতারের এই উদ্বেগ নতুন নয়। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশটির। সে সময় ইরানের পরমাণু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের জবাবে কাতারের আল উদেইদে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল ইরান। কাতারের ভূখণ্ডে এটিই ছিল কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রথম সামরিক হামলা। ওই সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নেমেছিল কাতার। সেই যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে।

বর্তমানে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশটিতে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। দিন যত গড়াচ্ছে, বিক্ষোভের তীব্রতাও তত বাড়ছে। আন্দোলনের মূল কারণ দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট। বছরের পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের ফলে ইরানি রিয়েল বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রাগুলোর একটি। এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ইরানি রিয়েল।

জাতীয় মুদ্রার এই বিপর্যয়কর অবস্থার কারণে ইরানে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। নিত্যদিনের জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন। সেই ধর্মঘট থেকেই আন্দোলনের সূচনা হয়। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামে। বর্তমানে বিক্ষোভকারীদের আন্দোলনে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পুরো দেশ।

বিক্ষোভ দমনে কঠোর পথে হেঁটেছে ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র সরকার। দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও মাঠে নামানো হয়েছে। বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে এ পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে।

এই বিক্ষোভের শুরু থেকেই ইরানের জনগণের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার তিনি ইরানি জনতাকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা আসছে।

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানবে ইরানের সেনাবাহিনী।

এই প্রেক্ষাপটে কাতারের সতর্কবার্তা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট যদি আন্তর্জাতিক শক্তির সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও এমন এক অস্থিরতার দিকে যাবে, যার পরিণতি সামাল দেওয়া কারও পক্ষেই সহজ হবে না।


বাংলাধারা/এসআর