ঢাকা, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২

টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারের গুলিতে আহত শিশু হুজাইফার ২৭ দিনের লড়াইয়ের অবসান

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০২৬, ০২:২৫ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত টেকনাফের শিশু হুজাইফা আফনান (১২) দীর্ঘ ২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে। 

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

হুজাইফার চাচা শওকত আলী গণমাধ্যমকে জানান, শনিবার সকালে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, “আমার ভাতিজির জন্য সবাই দোয়া করবেন।”

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসার একপর্যায়ে হুজাইফার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তাকে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে পরে আবার অবস্থার অবনতি ঘটে। হাসপাতালটির ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, শুরুতে শিশুটি নিজে নিজে শ্বাস নিতে পারলেও ধীরে ধীরে তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকে। ফলে গত বৃহস্পতিবার তাকে পুনরায় ভেন্টিলেশনে নিতে হয়।

তিনি আরও জানান, এরই মধ্যে হুজাইফার রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলেও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স দেখা দেয়। সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে গিয়ে শিশুটি শকে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত কোনো চিকিৎসাতেই সাড়া না পাওয়ায় তার মৃত্যু হয়।

উল্লেখ্য, গত ১১ জানুয়ারি সকালে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হয় স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের কন্যা হুজাইফা আফনান। প্রথমে তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হলে সেদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। দুই দিন পর, ১৩ জানুয়ারি, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ সে সময় জানিয়েছিলেন, অস্ত্রোপচার করা হলেও মস্তিষ্কে ঢুকে যাওয়া গুলিটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে মস্তিষ্কের চাপ কমানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মংডু টাউনশিপসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় সরকারি জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, মর্টার শেল নিক্ষেপ ও গোলাগুলি বেড়েছে। এসব সংঘর্ষের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদেও। টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় গোলার শব্দে ঘরবাড়ি কেঁপে উঠছে, গুলি এসে পড়ছে বসতঘর, চিংড়িঘের ও নাফ নদীতে।

হুজাইফার মৃত্যুর ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিশুটির মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পৃথক বার্তায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী গভীর শোক প্রকাশ করে হুজাইফার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্ত পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। তারা অবিলম্বে সীমান্তে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাধারা/এসআর