ঢাকা, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২

মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ১০:৪২ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

রক্তস্নাত ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারি আজ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালির আত্মপরিচয়, ভাষা ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রতীক এই দিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে সেইসব বীর সন্তানদের, যারা মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে ১৯৫২ সালের এই দিনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। পলাশ-শিমুলে রাঙা বসন্তের প্রভাতে আজও প্রতিধ্বনিত হয় অমর গান,  “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?”

একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
আজ সরকারি ছুটি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হচ্ছে এবং উত্তোলন করা হচ্ছে কালো পতাকা। দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে প্রভাতফেরি, কালো ব্যাজ ধারণ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচি।

১৯৪৭ সালের শেষদিকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় ভাষা-বিক্ষোভের সূচনা হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে তা আরও বিস্তৃত হয় এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে। ওইদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর, জব্বারসহ কয়েকজন শহীদ হন।
পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতা প্রতিবাদে রাজপথে নামে এবং শহীদদের স্মরণে গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতারাতি মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও আন্দোলনের গতি থামেনি।
পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জোরালো হয় এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন কার্যকর করা হয়।

একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের উদ্যোগ শুরু হয় প্রবাসী বাঙালিদের হাত ধরে। ১৯৯৮ সালে কানাডাপ্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান এর কাছে আবেদন জানান। পরে বিভিন্ন দেশের সমর্থন নিয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হলে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো অধিবেশনে ১৮৮টি দেশের সমর্থনে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়।
এরপর ২০০০ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করবে সদস্য রাষ্ট্রগুলো।

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য একই সঙ্গে বেদনা ও অহংকারের দিন। ভাষার অধিকারের জন্য প্রাণদানের এমন নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। শহীদদের আত্মত্যাগ কেবল একটি ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেনি, এটি স্বাধীনতার বীজ বপন করেছে, জাতিসত্তার ভিত্তি নির্মাণ করেছে।

আজকের দিনে জাতি শুধু শ্রদ্ধা জানায় না; নতুন করে শপথ নেয়, বাংলা ভাষার মর্যাদা, শুদ্ধতা ও বৈশ্বিক বিস্তারে কাজ করে ভাষা শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে।

বাংলাধারা/এসআর