ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২

বাংলা বছরের বিদায়বেলা, আজ চৈত্র সংক্রান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ১১:৫৫ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

পুরোনোকে বিদায় আর নতুনকে বরণ, এই চিরন্তন আবর্তনের মধ্য দিয়েই শেষ হচ্ছে আরেকটি বাংলা বছর। আজ ৩০ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; চৈত্র সংক্রান্তির এই দিনে বিদায়ের সুরে মিশে থাকে নতুনের প্রত্যাশা, নবজাগরণের নীরব আহ্বান।

চৈত্রের খরতাপ আর প্রকৃতির শুষ্কতার মধ্যেও এই দিনটি বাঙালির জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি কেবল একটি পঞ্জিকার সমাপ্তি নয়, বরং গত বছরের সব ক্লান্তি, ব্যর্থতা ও গ্লানিকে পেছনে ফেলে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রতীকী মুহূর্ত। তাই চৈত্র সংক্রান্তি একদিকে বিদায়ের দিন, অন্যদিকে নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি।

ঐতিহ্যের ধারায় চৈত্র সংক্রান্তি বহু আগে থেকেই বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অঞ্চলভেদে নানা রীতি ও আচার পালিত হলেও মূল চেতনা এক পুরোনোকে বিদায়, নতুনকে বরণ। একসময় এই উৎসব সীমাবদ্ধ ছিল পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে, তবে সময়ের পরিক্রমায় তা আজ সর্বজনীন রূপ পেয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণে এটি এখন এক সামগ্রিক সাংস্কৃতিক উৎসব।

গ্রামবাংলায় এই দিনের আবহ বিশেষভাবে প্রাণবন্ত। পুরোনো বছরের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন করে ‘হালখাতা’ খোলার প্রস্তুতি চলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। পাশাপাশি ঘরে ঘরে চলে পরিচ্ছন্নতা ও নতুন বছরকে বরণ করার আয়োজন।

খাদ্যসংস্কৃতিতেও রয়েছে এই দিনের বিশেষত্ব। অনেকেই আমিষ পরিহার করে নিরামিষ আহার করেন। কোথাও কোথাও ১৪ প্রকার শাক দিয়ে ‘শাকান্ন’ রান্নার প্রথা প্রচলিত, যা প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার কিছু অঞ্চলে ছাতু খাওয়ার রীতিও দেখা যায়। স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় তেতো ও শাকসবজি খাওয়ার এই প্রচলন দীর্ঘদিনের জীবনবোধেরই বহিঃপ্রকাশ।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দিনটি ধর্মীয় গুরুত্বও বহন করে। শিবপূজা, ব্রতপালনসহ নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা দিনটি পালন করেন। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা জানান।

সময়ের সঙ্গে শহুরে জীবনে এই উৎসবের রূপ কিছুটা বদলালেও গ্রামীণ ঐতিহ্যের আবহ এখনও অম্লান। বিভিন্ন স্থানে মেলা, পুতুলনাচ, যাত্রাপালা, লোকসংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন চৈত্র সংক্রান্তিকে করে তোলে আরও বর্ণিল।

এ বছরও দিনটিকে ঘিরে দেশব্যাপী নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তি। রাজধানীতে বিকেলে আয়োজিত লোকশিল্প প্রদর্শনী, অর্কেস্ট্রা, ধামাইল নৃত্য, জারিগান, পটগান ও পুঁথিপাঠের মতো আয়োজন বাঙালির ঐতিহ্যকে নতুন করে তুলে ধরছে।

সব মিলিয়ে, বিদায়ের বিষণ্নতা আর আগমনের আনন্দ এই দুইয়ের মিশেলে চৈত্র সংক্রান্তি বাঙালির হৃদয়ে এক অনন্য আবেগের নাম। পুরোনো বছরের ক্লান্তি পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্নে, নতুন প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ারই আহ্বান জানায় এই দিন।

বাংলাধারা/এসআর