ঢাকা, রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

১৬ মাসে ১১৩ মাজারে হামলা

সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ জোরালো

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ১৪, ২০২৬, ১১:২৫ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর গত ১৬ মাসে দেশে মাজার, দরগাহ ও সুফি সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো ক্রমেই সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাসা সেন্টার ও মাকামের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে সারা দেশে অন্তত ১১৩টি মাজার ও এ–সংক্রান্ত স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা বিভাগে, এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে। গবেষকদের মতে, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার সমন্বয়ে তৈরি এক ধরনের ধারাবাহিক সহিংসতার প্রতিফলন।

মাকামের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ১৬ মাসে অন্তত ৬৪টি মাজার, দরগাহ ও খানকায় হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি। বিভাগের ৯টি জেলায় ৩৭টি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও রাজবাড়ীসহ কয়েকটি জেলা এই সহিংসতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচ জেলার ২৭টি মাজার ও দরগাহে হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার বড় অংশ ঘটেছে কুমিল্লায়।

এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক হিসাবে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে পরবর্তী সাড়ে পাঁচ মাসে সারা দেশে ৪০টি মাজার ও সুফি সমাধিস্থলে ৪৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছিল, এসব ঘটনায় ভাঙচুর, ভক্তদের ওপর আক্রমণ, সম্পদ লুট এবং আগুন দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, মাঠপর্যায়ে বাস্তব চিত্র সরকারি দাবির চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ এবং অধিকাংশ ঘটনায় প্রশাসনের কার্যকর উপস্থিতি চোখে পড়েনি।

মাজারে হামলার ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বর্বর ও মানবতাবিরোধী ঘটনা ঘটে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে। নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবার শরিফকে ‘শরিয়ত পরিপন্থি’ আখ্যা দিয়ে একদল মানুষ সেখানে হামলা চালায়। দরবার ও বাড়িতে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের পর তারা কবর থেকে মরদেহ তুলে প্রকাশ্যে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। এই ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। ঘটনার পর থেকে দরবারের সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নুরুল হকের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম জানিয়েছেন, আতঙ্কের কারণে পরিবার ও ভক্তরা কেউই সেখানে থাকতে পারছেন না। একটি আগরবাতি জ্বালানোর সাহসও নেই।

কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার মনে করেন, মাজারে হামলার পেছনে যে মানসিকতা কাজ করছে, তা গভীরভাবে ফ্যাসিবাদী। তার ভাষায়, “আমি যা বলি সেটাই ঠিক, বাকিরা সব ভুল—এই ধারণা থেকেই সহিংসতা জন্ম নেয়।” তিনি বলেন, যারা মাজার, গান-বাজনা বা সাংস্কৃতিক চর্চাকে নিষিদ্ধ করতে চায়, তারা আসলে ইসলামের ঐতিহাসিক ধারার বিরোধী। কারণ এই উপমহাদেশে ইসলাম এসেছে পীর-আউলিয়াদের হাত ধরেই। সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় এই সহিংসতাগুলো দমন করা যায়নি।

মাকামের অনুসন্ধানেও একই চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা বলছে, ঢাকা বিভাগের ৮০ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ৯০ শতাংশ হামলার ঘটনায় প্রশাসন কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। অধিকাংশ ঘটনায় মামলা হয়নি, গ্রেপ্তার তো দূরের কথা, তদন্তেরও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এই নিষ্ক্রিয়তাই হামলাকারীদের আরও উৎসাহিত করেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তাদের মতে, বেশির ভাগ হামলার ক্ষেত্রেই মাজারকে ‘শিরক’ বা ‘বেদাত’ আখ্যা দিয়ে আগে থেকেই একটি ধর্মীয় বৈধতার বয়ান তৈরি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও মাদক সেবন বা অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে স্থানীয় জনমতকে উসকে দেওয়া হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে হামলাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

ঢাকা বিভাগে এসব হামলায় নারীসহ অন্তত ১৮০ জন আহত হয়েছেন এবং দুজন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে আহত হয়েছেন অন্তত ৩১ জন। হামলার পর থেকে ঢাকা বিভাগে অন্তত ১৮টি এবং চট্টগ্রামে ১২টি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। বহু জায়গায় বার্ষিক ওরস, মিলাদ কিংবা মেলা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে শুধু ধর্মীয় চর্চাই নয়, স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনও স্থবির হয়ে পড়েছে।

রাসা সেন্টার এসব হামলায় ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করে অন্তত ৫১০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে এবং প্রতিটি মাজারের ক্ষতির আলাদা বিবরণ আদালতে দাখিল করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা জাহিদা সুলতানা রত্মাজী জানিয়েছেন, এ সপ্তাহেই রিটের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, মাজার, মসজিদ, কবর ভাঙচুর কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনাগুলো কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়া নয়। এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অংশ। একদিকে মতাদর্শগত বিরোধীরা সক্রিয়, অন্যদিকে সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী এসব হামলার আড়ালে লুটপাটে জড়িয়ে পড়ছে। তার মতে, সরকার চাইলে প্রশাসন ও গোয়েন্দা কাঠামোর মাধ্যমে এসব সহিংসতার সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করে দায়ীদের চিহ্নিত করতে পারত, কিন্তু সেই সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট।

হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মহিউদ্দিন রাব্বানীও স্বীকার করেন, মাজার-দরগাহকে তারা শরিয়তের অংশ মনে করেন না। তবে তিনি বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ ইসলাম দেয় না। হামলা, ভাঙচুর ও সহিংসতা কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না।

১৬ মাসে একের পর এক মাজারে হামলার পরও কার্যকর প্রতিরোধ, জবাবদিহি কিংবা রাজনৈতিক দায় স্বীকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় প্রশ্ন উঠছে- এই সহিংসতা কি সত্যিই থামবে, নাকি নীরব প্রশ্রয়েই আরও বিস্তৃত হবে।


বাংলাধারা/এসআর