নবান্ন উপলক্ষ্যে পীরের আস্তানায় ক্ষিরের উৎসব
প্রকাশিত: নভেম্বর ২০, ২০২৫, ১০:৩৬ রাত
বাংলা বর্ষের অগ্রাহয়ণ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবারে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বেগুনগ্রামে চিশতীয়া তরিকার পীরের মাজারে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করেছেন পীর ভক্তরা। আগের দিন থেকেই চলছে তাদের নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি। নবান্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আয়োজনের দিক থেকে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে বেগুনগ্রামের এই আস্তানা। একদিন ব্যাপী চলে নবান্ন উৎসব। চলবে মধ্যরাত পর্যন্ত। মাজারের ভান্ডার খানার তথ্য মতে, ক্ষীর রান্নার প্রধান উপকরণ চাল, গুড়, দুধ ও নারিকেল। ক্ষীর রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশাল দুটি হাউস। ক্ষীর রান্নার কাজে সহযোগিতার জন্য ৩০০ জন ভক্ত স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন।

সরেজমিনে গিয়ে মাজার চত্বরে দেখা যায়, বেগুনগ্রাম আস্তানায় চিশতীয়া তরিকার পীর আব্দুল গফুর চিশতী (রা:) তার অনুসারীদের যেন ব্যস্ততার শেষ নেই। সকাল থেকে দূর দূরান্ত থেকে আসতে শুরু করেছে হাজার হাজার পীর ভক্ত। একসঙ্গে ২৯টি চুলায় রান্না করা হচ্ছে ক্ষীর। সকাল থেকে রান্না শুরু হলেও চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। স্বেচ্ছাসেবীদের দম ফেলানোর সময় নেই। কেউ গুড়, কেউ নারিকেল ভাঙছেন আবার কেউ রান্না করছেন। রান্না হয়ে গেলে হাউসে রাখা হচ্ছে সেই ক্ষীর।
নবান্ন উৎসবে আস্তানায় বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ভক্ত জমায়েত হয়েছে। নবান্ন উপলক্ষে এই গ্রামের মানুষরা তাদের জামাই-মেয়েসহ আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত করেছেন। উৎসবকে কেন্দ্র করে চলে নবান্ন মেলা। প্রতিটি ঘরে ঘরে চলছে ক্ষীর, পায়েস, মাছ ও মাংস রান্না। এই মেলাকে ঘিরে রাস্তার দুই পাশে বসেছে খাবার সামগ্রী ও মিষ্টান্নের দোকান। এছাড়াও সাংসারিক নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের দোকানও বসেছে।

বেগুনগ্রাম চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা ও ভক্ত তোতা চৌধুরী বলেন,‘প্রায় শত বছর আগে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে থাকা অবস্থায় কুমিল্লা জেলার হযরত খাজা শাহ মাওলানা মো. আব্দুল গফুর চিশতী (রা:) বেগুনগ্রামে আসেন। সেসময় এই এলাকার মানুষরা অভাবগ্রস্থ ছিল। বছরে প্রতি বিঘায় আমন ধান হতো ৬-৮ মণ। এই এলাকার মানুষের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকতের জন্য অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার হালকায়ে জিকিরের আয়োজন করেন। হালকায়ে জিকির শেষে এলাকার মানুষের মাঝে নতুন চাল ও গুড় দিয়ে তৈরি ক্ষীর সবার মাঝে বিতরণ করেন। সেই থেকে এই আস্তানায় নবান্ন উৎসবে ক্ষীর রান্নার আয়োজন চলে আসছে।’
আস্তানা পরিচালনা কমিটির সহ-সাধারন সম্পাদক সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এবার লোকজনের সমাগম বেশী। চাল ৮৩ মণ, গুড় ৪৯ মণ, নারিকেল ১ হাজার ৪০০ টি, দুধ ৭৫ মণ দিয়ে ক্ষীর রান্নার কাজ চলছে। দুপুরে খাবারের জন্য ৪০ মণ চালের ভাত, ২৫০ কেজি খাসির মাংস ও ৪৫ মণ আলু দিয়ে রানা করা হচ্ছে আলুঘাটি। রাতে হালকা জিকির শেষে ক্ষীর পরিবেশন করা হবে।
বাবুর্চি আব্দুল মান্নান বলেন, একযোগে ২৯টি চুলায় ক্ষীর রান্না করা হচ্ছে। ফজরের নামাজের পর থেকে শুরু হয়েছে। এই ক্ষীরগুলো রাতে ভক্তদের খাওয়ানো হয়।
সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বলেন,‘বেগুনগ্রাম পীরের মাজারে যে নবান্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা শুধু এলাকা ভিত্তিক নয়, পুরো উত্তরবঙ্গের সব চেয়ে বড় নবান্ন উৎসব। পীরে কামিল হযরত খাজা শাহ মাওলানা মোঃ আব্দুল আব্দুল গফুর চিশতী (রাঃ) বেগুনগ্রামে ১৯৬৫ সালের অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার থেকে ভক্তদের সম্মিলিত আয়োজনে এই নবান্ন উৎসব পালনের সূচনা করেন। সেই থেকে আজও নবান্ন উৎসব চলমান রয়েছে।’
আরেক ভক্ত আহসান চৌধুরী বলেন,‘এই নবান্ন অনুষ্ঠান অনেক পুরনো। এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। আস্তানায় নবান্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাম বাংলার সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে।’
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদ হোসেন বলেন,‘নবান্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র মাজার এলাকায় আইনশৃংখলা পরিস্থতি ঠিক রাখার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যাতে করে আস্তানা এলাকায় কোনো অঘটন না ঘটে।’
