নাফ নদীতে বেপরোয়া আরাকান আর্মি, উপকূলজুড়ে আতঙ্ক
প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৫, ১০:৪৪ দুপুর

ছবি: সংগৃহিত
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাফ নদী এখন জেলেদের জন্য আতঙ্কের জলপথে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশি জেলেদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু আগস্ট মাসের ২৩ দিনে ৬৩ জন জেলে ও ১০টি ট্রলার অপহৃত হয়েছে। শাহপরীর দ্বীপের উপকূলজুড়ে তাই বিরাজ করছে তীব্র শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা।
ট্রলার মালিক সমিতির তথ্যমতে, গত ৫ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত টেকনাফ উপকূলের বিভিন্ন স্থান থেকে একের পর এক ট্রলার ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। এর মধ্যে ৫ আগস্ট ১টি নৌকাসহ ২ জন, ১২ আগস্ট ১টি ট্রলারসহ ৫ জন, ২৩ আগস্ট ১টি ট্রলারসহ ১২ জন, ২৪ আগস্ট ২টি ট্রলারসহ ১৪ জন, ২৫ আগস্ট ১টি ট্রলারসহ ৭ জন এবং ২৬ আগস্ট ২টি ট্রলারসহ ১১ জনকে ধরে নিয়ে যায়। এভাবে টানা ২২ দিনে মোট ৫১ জন বাংলাদেশি জেলে অপহৃত হলেও তাদের এখনো ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ২৬ আগস্ট রাতে শাহপরীর দ্বীপের নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় মাছ শিকার শেষে ফেরার পথে দুটি ট্রলারসহ ১১ জেলেকে তুলে নিয়ে যায় বিদ্রোহীরা। এরপর থেকেই মাঝিমাল্লাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিজিবি, ট্রলার মালিক ও স্থানীয় জেলেদের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে অন্তত ২৫০ বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে বিজিবির প্রচেষ্টায় কয়েক দফায় ১৮৯ জন জেলে এবং ২৭টি ট্রলার ফেরত আনা সম্ভব হলেও এখনো ৫১ জন আরাকান আর্মির হেফাজতে রয়েছে।
বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ না থাকলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে চেষ্টা চলছে যেন আটক জেলেদের ফেরত আনা যায়। একইসঙ্গে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপহরণ বন্ধ হয়।
এদিকে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডও নাফ নদীতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি তারা সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৯টি ফিশিং বোটসহ ১২২ জন জেলেকে আটক করে। আটক জেলেদের মধ্যে ২৯ জন বাংলাদেশি এবং ৯৩ জন রোহিঙ্গা। কোস্টগার্ডের দাবি, যদি তারা এসব জেলেকে আটক না করত, তবে আরাকান আর্মির হাতে পড়ে অপহৃত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আরাকান আর্মি মূলত খাবার, অর্থ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর যোগান মেটাতেই বাংলাদেশি জেলেদের জিম্মি করছে। সম্প্রতি কুতুবদিয়া সাগরে ট্রলারভর্তি আলু জব্দ করায় গোষ্ঠীটি ক্ষুব্ধ হয়ে আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
ক্রমবর্ধমান অপহরণের ঘটনায় টেকনাফ উপকূলে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রতিদিন নতুন করে জেলে নিখোঁজ হওয়ার খবর আসায় পরিবারগুলো দিন কাটাচ্ছে উৎকণ্ঠায়। কেউ জানে না, অপহৃত প্রিয়জনরা আদৌ জীবিত আছেন কিনা। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন জানিয়েছেন, গত চার দিনে অন্তত ৪৪ জন জেলে ও ৬টি ট্রলার ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। এ ধরনের ঘটনা প্রতিদিন ঘটায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
উদ্ধার অভিযানে গতি আনা ও সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ট্রলার মালিক ও জেলে পরিবারগুলো। তারা বলছেন, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এ আতঙ্ক থেকে মুক্তি নেই।
বাংলাধারা/এসআর