রেকর্ড উৎপাদন ও মজুতের মধ্যেই চাল আমদানি, শঙ্কায় কৃষক
প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৭, ২০২৬, ১১:২৪ দুপুর
ফাইল ছবি
দেশে টানা তিন মৌসুম- আমন, বোরো ও আউশে- বাম্পার ফলনের পর সরকারি গুদামে জমেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ খাদ্যশস্য মজুত। বাজারে নতুন আমন চালের সরবরাহও স্বাভাবিকের চেয়ে ভালো। এমন পরিস্থিতিতেও সরকার বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়ায় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারের দাবি, সরু চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণ এবং আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে বাজার স্থিতিশীল রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। তবে কৃষক ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরু চালের সীমিত মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত বানিয়ে মূলত একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপই পূরণ করা হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমন ধানের দামে এবং সদ্য শুরু হওয়া বোরো মৌসুমের আবাদে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে গত ১৮ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে ২৩২টি প্রতিষ্ঠানকে ভারত থেকে বেসরকারিভাবে দুই লাখ টন সিদ্ধ চাল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমদানিকারকদের আগামী ১০ মার্চের মধ্যে চাল দেশে এনে বাজারে ছাড়তে হবে। শর্ত অনুযায়ী, আমদানিকৃত চালে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ ভাঙা দানা থাকতে পারবে এবং অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কারও নামে চাল পুনরায় প্যাকেটজাত করা যাবে না। এরই মধ্যে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে মাত্র দুই দিনে ভারত থেকে ৩৬টি ট্রাকে এক হাজার ৪৪৭ টন চাল দেশে প্রবেশ করেছে। অথচ এই সময়েই দেশের প্রায় সব বড় মোকাম ও মিল এলাকায় নতুন আমনের চাল নামতে শুরু করেছে। ভরা আমন মৌসুমে এমন আমদানিকে কৃষক ও বাজার বিশ্লেষকরা সময়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন হয়েছে চার কোটি ১৯ লাখ টন, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় চার দশমিক এক শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বোরো মৌসুমে দুই কোটি ২৬ লাখ টন, আমনে এক কোটি ৬৫ লাখ টন এবং আউশে ২৮ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আমন মৌসুমেও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, সারাদেশে ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে এবং এর মধ্যে ৫৩ লাখ ৭১ হাজার হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে। গড়ে প্রতি হেক্টরে তিন দশমিক ১১ টন উৎপাদন ধরে এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৯৭ লাখ টন ধান উঠেছে। অবশিষ্ট জমিতে একই হারে ফলন হলে আমনের মোট উৎপাদন দুই কোটি টনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
এদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি গুদামে প্রায় ২১ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যার মধ্যে চালই প্রায় ১৯ লাখ টন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার পরও এই মজুতের বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পরিমাণ সরকারি চাল মজুত নজিরবিহীন। তার ওপর চলতি আমন মৌসুমে সরকার রেকর্ড প্রায় ১০ লাখ টন চাল সংগ্রহ করেছে, যেখানে সাধারণত বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টনের বেশি সংগ্রহ হয় না।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে সরু চালের দাম কেজিতে দুই থেকে চার টাকা বেড়েছে। মূলত জিরাশাইল ও শম্পা কাটারির মতো সরু জাতের চালের দামই ঊর্ধ্বমুখী। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জিরাশাইল চালের দাম পাইকারি পর্যায়ে দেড় শতাংশ বাড়লেও খুচরা বাজারে তা বেড়েছে প্রায় আট শতাংশ। শম্পা কাটারির ক্ষেত্রেও খুচরা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। তবে চালকল মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই দুটি জাতের ধানের উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। বর্তমানে বোরো চাল বাজারে না থাকায় সরবরাহ কম, ফলে দাম সামান্য বেড়েছে। এর কোনো প্রভাব মাঝারি বা মোটা চালের ওপর পড়েনি। বরং নতুন আমনের চাল আসায় অনেক এলাকায় মোটা চালের দাম কমতির দিকে।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন জানান, জিরাশাইল ও শম্পা কাটারির দাম মিলগেটে দুই টাকার মতো বেড়েছে, তবে অন্য কোনো চালের দাম বাড়েনি। নতুন চাল বাজারে আসায় অনেক জায়গায় দাম বরং কমছে। এ অবস্থায় মাত্র দুটি সরু জাতের চালের দাম বৃদ্ধিকে সামনে রেখে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়াকে অযৌক্তিক বলছেন অনেকে।
দুটি গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের সন্ধিক্ষণে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের বাজারে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সরু চালের সীমিত সরবরাহকে বড় করে দেখিয়ে আমদানির সুযোগ সৃষ্টি এবং বাড়তি মুনাফা নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য। খাদ্য অধিদপ্তরের ভেতরের একটি অংশও এই উদ্যোগে নীরব সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, অতীতেও বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত চালের একটি অংশ সরকারকে বিক্রি করে মিলাররা প্রতি কেজিতে পাঁচ থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত মুনাফা করেছেন। এবারও একই পথ অনুসরণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারি মজুত, স্থানীয় উৎপাদন এবং বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তাঁর মতে, এখন সরকারের মজুত ভালো, উৎপাদনও পর্যাপ্ত এবং বাজারে সরবরাহের ঘাটতি নেই। এই অবস্থায় আমদানি করলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কৃষকের ওপর। বোরো মৌসুমে ধানের দাম কমে গেলে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাবেন। মিল মালিক ও কৃষি সংশ্লিষ্টরাও আশঙ্কা করছেন, বাজারে আমদানিকৃত চাল ঢুকলে মিলগেটে ধানের দাম কমে যাবে, যা কৃষকের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
তবে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সরু চালের উৎপাদন মূলত বোরো মৌসুমে হয় এবং বোরোর চাল বাজারে আসতে এখনো সময় লাগবে। সে কারণে সরু চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবুও বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত, মাত্র দুটি সরু জাতের চালের দাম বৃদ্ধির কারণে পুরো বাজারের জন্য আমদানির দরজা খুলে দেওয়া নয়, বরং বাজার মনিটরিং জোরদার করে মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারত বেশি কার্যকর সমাধান।
বাংলাধারা/এসআর
