ভূমিকম্পের পর শিক্ষাঙ্গনে অচলাবস্থা
ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত, শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা চরমে
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৪, ২০২৫, ১১:১৭ দুপুর
ছবি: সংগৃহিত
টানা চার দফা ভূমিকম্পের পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আচমকা কাঁপুনির পর শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই এখন গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। শুক্রবার ও শনিবার হওয়া ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে প্রথমটির কেন্দ্র ছিল নরসিংদীতে, যেখানে ১০ জনের মৃত্যু ও বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা জনমনে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্কুলশিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানান, পরপর কয়েকবার ভূমিকম্পের ধাক্কায় শিশুরা এখন পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না, একা থাকতে ভয় পাচ্ছে, এমনকি রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছে না। মনোবিদদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কজনক পোস্ট ও টানা কাঁপুনির কারণে কোমলমতি শিশুরা মানসিক চাপে পড়ছে, ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটছে।
এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক নিজেদের কার্যক্রম স্থগিত করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকম্প-পরবর্তী ঝুঁকি বিবেচনায় হল সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে হলে হলে নোটিশ পাঠিয়েছে। প্রভোস্ট কমিটির জরুরি ভার্চুয়াল সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিকেল পাঁচটার মধ্যে হল ছাড়তে বলা হয়, মূল্যবান জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে এবং কক্ষের চাবি প্রশাসনের কাছে জমা দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে সব ডাইনিং ও ক্যান্টিন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে অনেক শিক্ষার্থী বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে মেয়েদের হলগুলোতে পানি ও বিদ্যুৎসেবা বন্ধ করে দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত হল ছাড়তে বাধ্য হন। সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী স্বর্ণা দাশ জানান, তার টিউশনসহ নানা কাজ থাকায় হঠাৎ করে হল বন্ধ হওয়া তাকে চরম সমস্যায় ফেলেছে, কিন্তু থাকার জায়গা না থাকায় বাড়ি চলে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ও একই পরিস্থিতিতে চার দিনের জন্য সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করেছে। পাশাপাশি নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের শিক্ষার্থীদের আজ সকাল দশটার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২৪ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে যেসব বিভাগে মৌখিক পরীক্ষা চলছে, শিক্ষার্থীদের লিখিত সম্মতির ভিত্তিতে সেসব পরীক্ষা নেওয়া হবে।
স্কুল-কলেজগুলোর পরিস্থিতিও একই রকম। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রথম থেকে নবম শ্রেণির সব বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করেছে। অভিভাবকদের অনুরোধ এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক অস্থিরতা বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজও চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণির পরীক্ষা স্থগিত করেছে। অনেক জায়গায় পরীক্ষার সময়সূচি বাতিল হলেও ঢাকার বেশিরভাগ স্কুল রোববার স্বাভাবিক ক্লাস-পরীক্ষা চালিয়েছে।
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় সব পর্ব-মধ্য পরীক্ষা ও ক্লাস স্থগিত করে রাত ৯টার মধ্যে সব আবাসিক হল খালি করার নির্দেশ দেয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় লতিফ ছাত্রাবাস, ড. কাজী মোতাহার হোসেন ছাত্রাবাস, জহির রায়হান ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাস সাময়িকভাবে খালি করতে বলা হয়েছে।
এদিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হলে এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি হলে ফাটল দেখা দিয়েছে। কিছু হলে লিফট জরুরি নিরাপত্তা প্রটোকলে বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, নতুন নির্মাণ করা ভবনেই বেশি ফাটল দেখা যাচ্ছে- যা নির্মাণে অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজও তাদের সব একাডেমিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ৩০ নভেম্বর এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উভয় প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষরা জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই তাদের প্রধান বিবেচ্য।
পরিস্থিতির মাঝে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভূমিকম্পের আগে ও পরে করণীয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশনা পাঠিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ড্রিল এবং নিরাপত্তাবিষয়ক দিকনির্দেশনা শেখানোর কথা বলা হয়েছে। এদিকে টাঙ্গাইলে এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার জানান, ভূমিকম্প যে কোনো সময় হতে পারে; তাই আতঙ্ক নয়, বরং সতর্কতা অবলম্বনই এখন সবচেয়ে জরুরি। আপাতত প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধের পরিকল্পনা নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।
টানা ভূমিকম্পে পুরো শিক্ষাঙ্গনে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব এখন পড়ছে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তার ওপর। অনিশ্চয়তায় থাকা শিক্ষার্থীদের সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়- সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বাংলাধারা/এসআর
