ঢাকা, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

প্রার্থিতা বাতিলে আটকে গেল জামায়াত-এনসিপি জোটের আসন সমঝোতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ০৭, ২০২৬, ১০:০৮ দুপুর  

ফাইল ছবি

মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দলের নির্বাচনী সমঝোতায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোন আসনে শেষ পর্যন্ত কোন দলের প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবেন, সে অনিশ্চয়তায় আসন বণ্টন প্রক্রিয়া কার্যত থমকে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আজ বুধবার জোটভুক্ত দলগুলোর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে নেতারা বলছেন, জটিলতা থাকলেও সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।

১১ দলীয় জোট সূত্র জানায়, প্রাথমিক সমঝোতায় এনসিপিকে ৩০টি আসন ছাড়তে রাজি হয়েছিল জামায়াত। মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে দেওয়া হওয়ার কথা ছিল ১৩টি আসন। খেলাফত মজলিসের অপর অংশ ও এলডিপিকে ছয়টি করে, এবি পার্টি ও খেলাফত আন্দোলনকে তিনটি করে, নেজামে ইসলামকে দুটি এবং জাগপা ও বিডিপিকে একটি করে আসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সব মিলিয়ে জামায়াত ৬৫টি আসন ছেড়ে দিতে সম্মত ছিল।

এর বাইরে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গেও বড় পরিসরে সমঝোতায় পৌঁছায় জামায়াত। ১৮৩ আসনে যৌথভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম দফায় ইসলামী আন্দোলনকে ৩১টি আসন ছেড়ে দিতে রাজি ছিল জামায়াত। নিজেদের জন্য তারা রাখে ১৫২টি আসন। বাকি ৫২টি আসন দুই দলের মধ্যে জরিপের ভিত্তিতে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যেখানে যে দলের প্রার্থী অবস্থানে এগিয়ে থাকবেন, সেই দল ওই আসন পাবে— এমন নীতিতেই একমত হয়েছিল উভয় পক্ষ।

কিন্তু মনোনয়নপত্র যাচাইয়ে ব্যাপক সংখ্যক প্রার্থী বাদ পড়ায় এই হিসাব পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে। জামায়াত সূত্র জানায়, দলটি মোট ১৯০ আসনে নির্বাচনের পরিকল্পনা করেছিল। ইসলামী আন্দোলনকে সর্বোচ্চ ৪৫টি এবং এনসিপিসহ অন্য ৯ দলকে ৬৫টি আসন ছাড়ার ভাবনা ছিল। তবে সমঝোতায় থাকা অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় আসন বণ্টন নতুন করে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে কুড়িগ্রাম-৩, যশোর-২, ঢাকা-২ ও কক্সবাজার-২ আসনের কথা উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব আসনে ১১ দলের সমর্থনে জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু চার আসনেই জামায়াত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, জামায়াত ২৭৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। এর মধ্যে ৯ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের ২৬৬ আসনের মধ্যে ৩৯টিতে প্রার্থী টেকেনি। এনসিপির ৪৪ আসনের মধ্যে তিনটিতে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত ৯৬ আসনে প্রার্থী দিলেও ১১টি আসনে তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়নি।

বাংলাদেশ খেলাফতকে যে ১৩টি আসন দেওয়ার কথা ছিল, তার একটি মুন্সীগঞ্জ-৩। সেখানে খেলাফতের প্রার্থী নুর হোসাইন নুরানীর পক্ষে জামায়াত নিজস্ব প্রার্থী দেয়নি। কিন্তু বাছাইয়ে নুরানীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বিপরীতে একই আসনে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের অপর অংশের প্রার্থীরা বৈধতা পেয়েছেন। আপিলে নুরানীর প্রার্থিতা ফিরে না এলে, এই আসনে কে নির্বাচন করবেন তা নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা।

একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে ভোলা-৪ আসনে, যা ইসলামী আন্দোলনকে ছাড়ার কথা ছিল। সেখানে হাতপাখার প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এনসিপিকে দেওয়া সিলেট-১ আসনেও দলটির প্রার্থী বাদ পড়েছেন। জাগপাকে যে আসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেখানেও প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে।

এদিকে নতুন সমঝোতা আলোচনায় বাংলাদেশ খেলাফত অন্তত ২৫টি আসন দাবি করেছে। গত ২৬ ডিসেম্বর এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি জোটে যোগ দেওয়ায় মামুনুল হকের দল নিজেদের ভাগ থেকে তিনটি আসন ছাড়তে রাজি হয়। তবে জামায়াত ১৩টির বেশি আসন দিতে অনড় অবস্থানে আছে।

নতুন আলোচনায় খেলাফত বলছে, যেসব আসনে তাদের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র আপিলে বৈধ হবে, সেখানে অন্য আসন সমন্বয় করতে হবে। তারা এমন কিছু আসন চাইছে, যা আগের আলোচনায় জামায়াতের ভাগে ছিল।

অন্যদিকে জামায়াত প্রস্তাব দিয়েছে, আপিলে প্রার্থিতা বৈধ না হলে তারা নিজেদের ভাগের ঢাকা-২ আসন ইসলামী আন্দোলনকে ছেড়ে দেবে। এর বিনিময়ে ইসলামী আন্দোলনকে আগে পাওয়া আসন থেকে একটি কম নিতে হবে। তবে এ প্রস্তাবে রাজি নয় চরমোনাই পীরের দল।

১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের কক্সবাজার-২ আসনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি বলেন, আসন বণ্টনের আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। কিছু মনোনয়নপত্র প্রশাসনিক পক্ষপাতের কারণে বাতিল হয়েছে বলে আমরা মনে করি। নির্বাচন কমিশন থেকে প্রতিকার পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।

ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুস আহমেদ সেখ বলেন, মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোন আসনে কার প্রার্থিতা বৈধ বা অবৈধ হয়েছে, তা যাচাই করেই সমঝোতায় যেতে হচ্ছে। এ কারণেই কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। আজ জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা হবে। আপিলের ফল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলেও মাঠে প্রার্থীরা সক্রিয় আছেন। তাই বিলম্ব হলেও নির্বাচনে বড় কোনো সমস্যা হবে না।


বাংলাধারা/এসআর