ঢাকা, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

জোটের ঐক্য রক্ষায় কঠোর বিএনপি

তারেক রহমানের নির্দেশে সরে দাঁড়াচ্ছেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ১২, ২০২৬, ১২:৩২ দুপুর  

ফাইল ছবি

শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। তবে ধানের শীষের মনোনয়ন না পাওয়ায় দলের অনেক নেতা এখনো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে থাকায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে দলটি। শতাধিক আসনে এই অবস্থান বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কারণ দলটির মূল লক্ষ্য একটাই- ধানের শীষ ও জোট প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কোনো নেতা যেন অন্য কোনো প্রতীকে নির্বাচনে না থাকেন, তা নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। এই বাস্তবতায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে থাকা নেতাদের নির্বাচন থেকে সরাতে দলের ভেতরে তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি করানোর উদ্যোগ চলছে। অঞ্চলভিত্তিক জ্যেষ্ঠ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নিজ নিজ এলাকায় থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে দলীয় সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে ভবিষ্যতে কী ধরনের সাংগঠনিক পরিণতি হতে পারে, সে বিষয়েও তাদের ধারণা দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সর্বশেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন। বিশেষ করে যেসব আসন সমঝোতার ভিত্তিতে জোট শরিকদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেসব আসনে থাকা বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে ধানের শীষ বা জোট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার স্পষ্ট নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি।

দলীয় সূত্র আরও জানায়, সরকার গঠন হলে এসব নেতার রাজনৈতিক মূল্যায়ন করা হবে—এমন আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। বহিষ্কৃত নেতাদের ক্ষেত্রে শিগগির বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এরই মধ্যে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা কয়েকজন নেতা নির্বাচনে না থাকার সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। বিএনপির আশা, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারির মধ্যেই এই সংকটের বড় অংশের সমাধান সম্ভব হবে।

যদিও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া নেতাদের বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে বিবেচনা করছে, তবুও তাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা ও ত্যাগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আপাতত কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে না দলটি। বরং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। দলীয়ভাবে এই প্রক্রিয়াকে বিদ্রোহী নেতাদের জন্য শেষ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরপরও কেউ নির্বাচনের মাঠে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। এরই মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় ১০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে দলটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বোঝানোর চেষ্টা চলছে এবং এ কাজে বিএনপি চেয়ারম্যান নিজেও সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। তিনি বলেন, এসব নেতাকর্মী দলের ত্যাগী কর্মী হলেও ২০ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে দল বাধ্য হয়ে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।

আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি শরিকদের সঙ্গে ১৭টি আসনে সমঝোতায় পৌঁছেছে। ১২টি দলের সঙ্গে হওয়া এই সমঝোতার বেশিরভাগই ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক। কেউ ধানের শীষ প্রতীকে, আবার কেউ সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তবে এসব আসনের অনেকগুলোতেই বিএনপির নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়ে যাওয়ায় জোট নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য- যেসব আসন তাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোনো ব্যানারেই যেন বিএনপির প্রার্থী না থাকে। তাদের মতে, এসব আসনে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই জোট প্রার্থীদের বিজয়ের প্রধান অন্তরায়।

এই বিষয়গুলো নিয়ে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরসহ একাধিক জোট নেতা আলাদাভাবে বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে জানিয়েছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরানো না গেলে জোটের ঐক্য ও নির্বাচনী কৌশল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এরই অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতির প্রার্থী জোনায়েদ সাকির বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল খালেককে গত ৮ জানুয়ারি ঢাকায় ডেকে কথা বলেন তারেক রহমান। সেখানে তাকে নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে সাকির পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে তিনি নির্বাচনে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং বলেন, দলের বাইরে গিয়ে আর কিছু করার সুযোগ নেই, চেয়ারম্যান যখন ডেকেছেন তখন তার সিদ্ধান্ত মানতেই হবে। একই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের সঙ্গেও কথা বলেন তারেক রহমান। পরে এক ভিডিওবার্তায় তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তার ব্যক্তিগত সহকারী জানান, বিএনপির চেয়ারম্যান তাকে দলে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আশ্বাস দিয়েছেন।

দলীয় সূত্র জানায়, গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোয় থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে শিগগিরই আরও কয়েকজনকে ঢাকায় ডাকা হবে। জোটের ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখা এবং ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতেই এই কৌশলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। দলটির মূল্যায়ন হলো- বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে নির্বাচনী মাঠে তাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই দলীয় শৃঙ্খলাই এখন বিএনপির সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।


বাংলাধারা/এসআর