ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি, বাস্তবে ব্যয়বৃদ্ধির বৃত্তে সরকার
প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৬, ২০২৬, ১২:২৮ দুপুর
ফাইল ছবি
সরকারি ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার নিয়েই দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ব্যয়সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণের ঘোষণা, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র জারি করা হয়। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার ক্রমেই বাড়ছে দূরত্ব। কাগুজে সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে পরিচালন খাতে একের পর এক ব্যয়বর্ধক উদ্যোগ সরকারের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
এরই ফল হিসেবে সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় রাজস্ব আয়ের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। অথচ রাজস্ব আদায়ে বড় অঙ্কের ঘাটতি এখনও কাটেনি।
গত অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো। জাতীয় পে কমিশন বিদ্যমান বেতন-ভাতা ও পেনশন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা কার্যকর হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।
একই সময়ে ভবিষ্যৎ সরকারের মন্ত্রীদের জন্য ঢাকার মন্ত্রীপাড়ায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির মুখে পড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সিদ্ধান্ত নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য শুরুতেই বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর্থিক বিশ্লেষণ ও অর্থ সংস্থানের পরিকল্পনা করা হয়। সরকারের অর্থ জোগানের সক্ষমতা রয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং বিগত সরকারের আমলে আর্থিক খাতে দুর্নীতির প্রভাব পুরো অর্থনীতিকে নাজুক করে তোলে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় একাধিক নির্দেশনা জারি করে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এসব নির্দেশনার বাইরে গিয়েই পরিচালন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এর সূচনা হয় ২০২৪ সালের শেষ দিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ দিয়ে। তীব্র সমালোচনার মুখে সিদ্ধান্তটি বাতিল হলেও ২০২৫ সালের জুলাই থেকে গ্রেডভেদে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক সুবিধা কার্যকর করা হয়।
পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ১৬ বছরে অবসর নেওয়া ৭৬৪ জন সাবেক কর্মকর্তাকে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১৯ জনকে সচিব পদে উন্নীত করা হয়।
এ ছাড়া প্রশাসন ক্যাডার বাদে অন্যান্য ক্যাডারের আরও ৭৮ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলমান। এসব সিদ্ধান্ত সরকারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি করেছে।
চলতি ও গত অর্থবছরে একের পর এক ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ভাতা দ্বিগুণ করা হয়েছে, প্রশিক্ষকদের ভাতা বাড়ানো হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকিভাতা বাড়ানো হয়েছে ২০ শতাংশ, এতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
গ্রাম পুলিশ বাহিনীর বেতন ও অবসরকালীন ভাতা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ৬০টি কূটনৈতিক মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বৈদেশিক ভাতা ২০ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে বছরে অতিরিক্ত ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে সারাদেশে ১ হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ পরিচালন ব্যয় আরও বাড়াবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে তিন দফায় সরকারি যানবাহন কেনার মূল্যসীমা বাড়ানো হয়েছে। একই সময়ে ঢাকার মন্ত্রীপাড়ায় ৭২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণে প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রীদের জন্য গাড়ি কেনার একটি প্রস্তাব সমালোচনার মুখে বাতিল হলেও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য ২২০টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। উন্নয়ন খাত থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে পরিচালন ব্যয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা যুক্ত করা হয়েছে। শুধু বেতন-ভাতা খাতেই বাড়তি ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গত অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায় ছিল ৪ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, অথচ পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকায়- অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের চেয়েও পরিচালন ব্যয় বেশি ছিল প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদের মতে, রাজস্ব দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটাতে না পারা আশঙ্কাজনক। নব্বইয়ের দশকের পর এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত নয়।
বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ বলেন, রাজস্ব বাড়ানো ছাড়া পরিচালন ব্যয় বাড়ানো একটি ঝুঁকিপূর্ণ পথ। বেতন বাড়িয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, ব্যয় কমানোর অঙ্গীকার করা একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়। পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে উন্নয়ন ব্যয় কমানো বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
বাংলাধারা/এসআর
