গাজা, ইউক্রেন থেকে ভেনেজুয়েলা: জাতিসংঘ কেন বারবার ‘পক্ষাঘাতগ্রস্ত’ হয়ে পড়ে
প্রকাশিত: জানুয়ারী ০৭, ২০২৬, ১০:২৯ দুপুর
ছবি: সংগৃহিত
গত বছরের অক্টোবরে জাতিসংঘ তার প্রতিষ্ঠার ৮০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করেছে। দীর্ঘ এই সময় টিকে থাকা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংকট সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং সর্বশেষ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ- প্রতিটি ক্ষেত্রেই জাতিসংঘ কার্যত অসহায় দর্শকের ভূমিকায়।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়েই জাতিসংঘের জন্ম। অথচ এই তিনটি সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, পরাশক্তিগুলোর সরাসরি জড়িত থাকার ক্ষেত্রে সংস্থাটি কতটা সীমাবদ্ধ। ফলে প্রশ্ন উঠছে- জাতিসংঘ কি ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে, নাকি এর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাই একে বারবার পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে তুলছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তাকাতে হবে জাতিসংঘের সবচেয়ে শক্তিশালী অঙ্গ, নিরাপত্তা পরিষদের দিকে।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্ব জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের। সনদ অনুযায়ী, কোনো সামরিক অভিযানের বৈধতা পেতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন, যদি না সেটি আত্মরক্ষার আওতায় পড়ে। আত্মরক্ষার এই অধিকারও তখনই বৈধ থাকে, যতক্ষণ না নিরাপত্তা পরিষদ হস্তক্ষেপ করে।
নিরাপত্তা পরিষদে মোট ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য— চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। এই পাঁচ দেশই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তি, যাদের পি-৫ নামে পরিচিত করা হয়। বাকি ১০টি দেশ দুই বছরের জন্য অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়।
কোনো প্রস্তাব গৃহীত হতে হলে কমপক্ষে ৯টি ভোট প্রয়োজন এবং স্থায়ী সদস্যদের কেউ ভেটো দিতে পারবে না। এই একটি নিয়মই পরিষদের ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি পি-৫-এর দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। শান্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রায় সব সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে এই পাঁচ দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
এই কাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবেই এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে জাতিসংঘ পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারে। একদিকে এটি শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাত এড়ানোর একটি উপায় ছিল, অন্যদিকে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের নামে কার্যত ছাড় দেওয়া হয়েছিল। সমস্যা হলো, এই ভারসাম্য তখনই কাজ করে, যখন পি-৫ দেশগুলো নিজেরাই নিয়ম মানে। তারা নিয়ম ভাঙলে জাতিসংঘের হাতে থাকে কেবল নিন্দা জানানোর ক্ষমতা।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভূমিকা দেখিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন যত বড় পরিসরে লঙ্ঘিত হোক না কেন, ভেটো ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদকে অচল করে দিতে পারে। এই বাস্তবতা থেকেই ভেটো ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি বারবার উঠছে।
কিন্তু ভেটো ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ সনদে কোনো আইনি সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। কোনো দেশ নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে ভেটো দিলে অন্যরা কেবল সমালোচনা করতে পারে, বৈধতার প্রশ্ন তুলতে পারে না। এখানেই জাতিসংঘ ব্যবস্থার অন্যতম গভীর ও ইচ্ছাকৃত ত্রুটি।
সনদের ১০৮ ও ১০৯ অনুচ্ছেদে তাত্ত্বিকভাবে সংস্কারের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় অসম্ভব। কারণ, সংস্কারের জন্যও পি-৫ দেশগুলোর সম্মতি দরকার, আর তারা নিজের ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগে ভেটো দিতে পারবে।
বাস্তব অর্থে একমাত্র বিকল্প হলো বর্তমান সনদ বাতিল করে নতুন সনদের অধীনে জাতিসংঘকে পুনর্গঠন করা। কিন্তু সেই মাত্রার বৈশ্বিক ঐক্য এই মুহূর্তে নেই। বরং পি-৫-এর এক বা একাধিক দেশ নিজেদের স্বার্থে যেকোনো উদ্যোগ আটকে দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ফলে একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে- পি-৫ ভুক্ত কোনো দেশ আগ্রাসনে জড়ালে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অক্ষম হয়ে পড়ে। এই কারণেই গাজা, ইউক্রেন বা ভেনেজুয়েলার মতো সংকটে জাতিসংঘকে ব্যর্থ মনে হয়। কিন্তু এই ব্যর্থতা ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত।
তবে শুধু নিরাপত্তা পরিষদের সীমাবদ্ধতা দিয়ে জাতিসংঘের পুরো ভূমিকাকে বিচার করলে সেটি অসম্পূর্ণ চিত্র হবে। পরাশক্তির সংঘাতে সংস্থাটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলেও এটি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়।
জাতিসংঘের অন্যান্য ভূমিকার মধ্যে রয়েছে শান্তিরক্ষা ও রাজনৈতিক মিশনে সহায়তা, মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন, মানবিক ত্রাণ সমন্বয়, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাজ। অনেক ক্ষেত্রে এই কাজগুলো এমন পরিসরে হয়, যা একক কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়।
বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘ নিখুঁত প্রতিষ্ঠান নয়। কিন্তু এটি বিলুপ্ত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে অন্তত একটি বৈশ্বিক কাঠামোর ভেতরে ধরে রাখার চেষ্টা করাই এই সংস্থার সবচেয়ে বড় অবদান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরাশক্তিগুলো যেন পুরোপুরি জবাবদিহির বাইরে চলে যেতে না পারে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের প্রকাশ্য দ্বিচারিতার কারণে জাতিসংঘকে একেবারে বাতিল করে দেওয়ার চেয়ে, এর সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে চাপ তৈরি করাই বাস্তবসম্মত পথ।
কারণ বিকল্প না থাকলে, এই অসম্পূর্ণ ব্যবস্থাটাই শেষ পর্যন্ত মন্দের ভালো হয়ে টিকে থাকে।
বাংলাধারা/এসআর
