ঢাকা, শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২

জাতীয় সংসদ নির্বাচন:

পদ্ধতিগত দ্বন্দ্বে রাজনীতির নতুন সমীকরণ

শারমিন রহমান

 প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২৫, ০৪:৪৬ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো ঘোষণা হয়নি, কিন্তু এর আগেই দেশের রাজনীতি যেন অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র নির্বাচনী সাড়া লেগে গেছে। বিশেষ করে বিএনপি তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মাঠ সরগরম রেখেছে। মিছিল, পদযাত্রা, সমাবেশ কিংবা প্রচারণা- সব কিছুর ভেতরেই তারা নির্বাচনী প্রস্তুতি ও নির্বাচনী পদ্ধতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকে সমান্তরালে এগিয়ে নিচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, জনগণকে রাজনীতির প্রক্রিয়ার ভেতর সক্রিয় রাখা জরুরি, আর তাই তারা একদিকে সরকারের সমালোচনা তুলে ধরছেন, অন্যদিকে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

কিন্তু শুধু কর্মসূচি নয়, নির্বাচনের আগে রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ভোটের পদ্ধতি নিয়ে তুমুল বিতর্ক। প্রচলিত প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থার বাইরে এসে ছোট ও নতুন রাজনৈতিক দলগুলো জোরালোভাবে দাবি তুলেছে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি চালুর। তাদের যুক্তি, এতে প্রতিটি দলের জনসমর্থন অনুযায়ী সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে এবং ছোট দলগুলোও জাতীয় রাজনীতিতে টিকে থাকার সুযোগ পাবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যেই এই দাবি নিয়ে সরব, তাদের মতে পিআর পদ্ধতি রাজনীতিকে বহুমাত্রিক করবে এবং গণতন্ত্রকে নতুন রূপ দেবে।

অন্যদিকে বড় রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রস্তাবের বিপক্ষে একেবারেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিএনপিসহ প্রধানধারার দলগুলোর বিশ্বাস, প্রত্যক্ষ ভোটেই জনগণের মতামত সবচেয়ে প্রকৃতভাবে প্রতিফলিত হয়। তারা মনে করে, পিআর পদ্ধতি চালু হলে ভোটার সরাসরি প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ হারাবে, দলীয় কোটা অনুসারে আসন বণ্টনের কারণে সংসদ অচলাবস্থার ঝুঁকিতে পড়বে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হবে। বড় দলগুলো যেহেতু জনসমর্থনে আত্মবিশ্বাসী, তাই তারা প্রচলিত ব্যবস্থাকেই একমাত্র কার্যকর মনে করছে।

এই মতবিরোধ কেবল পদ্ধতিগত প্রশ্নে আটকে নেই; বরং এর ভেতর দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে রাজনীতির গভীর ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ। বড় দলগুলো প্রত্যক্ষ ভোটে নিজেদের শক্তিকে ব্যবহার করতে চায়, অন্যদিকে ছোট দলগুলো নিজেদের টিকে থাকার পথ হিসেবে পিআর পদ্ধতিকে সামনে টেনে আনছে। ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও প্রকট হচ্ছে- একদিকে প্রধান শক্তিগুলোর ঐক্য, অন্যদিকে ছোট দলগুলোর ভিন্নমুখী অবস্থান নতুন সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।

সবকিছুর মাঝে বিএনপি তাদের আন্দোলন ও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। তারা জানে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কোন পথে ভোট হবে। কিন্তু তার আগেই তারা জনগণের সামনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে এবং মাঠে সক্রিয়তা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

এখন সবার চোখ নির্বাচন কমিশনের দিকে। প্রচলিত প্রত্যক্ষ ভোটই কি বহাল থাকবে, নাকি ছোট দলগুলোর দাবিতে পিআর পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার কোনো অগ্রগতি হবে- সে প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, পদ্ধতি নিয়ে এই দ্বন্দ্ব যত বাড়ছে, দেশের রাজনৈতিক আবহ ততই অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে উত্তাপ কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং প্রতিটি দিন পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই উত্তাপ আরও বেড়ে চলেছে।

বাংলাধারা/এএস