ঢাকা, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪৩২

কেন বারবার আগুন কড়াইল বস্তিতে? ভাঙা জীবনের গল্প এখন চিরচেনা পুনরাবৃত্তি

নিউজ ডেস্ক

 প্রকাশিত: নভেম্বর ২৬, ২০২৫, ১০:৪৪ রাত  

ছবি: সংগৃহিত

ভূমিকম্পের আতঙ্ক এখনো কাটেনি রাজধানীবাসীর মনে। এরই মধ্যে ঢাকার সবচেয়ে বড় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা কড়াইল বস্তি আবারও জ্বলে উঠল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে। মহাখালী-গুলশানের আকাশছোঁয়া অট্টালিকার ঠিক বিপরীতে টিনের চালের ঘিঞ্জি ঘরগুলোর এই এলাকা আলাদা দুই পৃথিবীর গল্প বলে- যার এক পাশে ক্ষমতার আঁতাত, অন্য পাশে দিনমজুরির বেঁচে থাকা। এই বস্তিতে আগুন যেন এক পুরোনো, অনাহূত অতিথি- যে ফিরে ফিরে আসে, রেখে যায় ছাই, কান্না আর নতুন অসহায়ত্বের স্তর।

টানা আগুনের ঘটনা কড়াইলবাসীর মনে এমন এক আতঙ্ক তৈরি করেছে, যার ভাষা শুধু তারাই জানে। এমন শহরে যেখানে কাঁচের দালান আর বিলাসিতার সাথে পাল্লা দিয়ে অন্যরা কার্ডবোর্ড, প্লাস্টিক, টিন আর বাঁশের ওপর ভর করে দিনযাপন করে, সেই শহরের আগুন কেবল ঘর পুড়িয়ে দেয় না- পুড়িয়ে দেয় নিরাপত্তা, ন্যায্যতা আর জীবনের ক্ষুদ্র স্বপ্নগুলোও।

মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। চার ঘণ্টার বেশি সময় লড়াইয়ের পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে, আর পরদিন সকাল সাড়ে ৯টায় পুরোপুরি নির্বাপণ সম্ভব হয়। কিন্তু এর আগেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় অন্তত ১২০০ ঘর- যেখানে ছিল মানুষের জীবন, স্মৃতি, আশা আর বেঁচে থাকার শেষ সঞ্চয়।

স্থানীয়রা জানান, বউবাজারের কুমিল্লা পট্টি, বরিশাল পট্টি ও ক-ব্লক এলাকা থেকে আগুনের সূত্রপাত। সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো বস্তিটাই যেন দাহ্য উপাদানের এক জোড়াতালির শহর- কাঠ, টিন, কার্ডবোর্ড আর প্লাস্টিকে গড়া ঘর। কোথাও কোথাও একই টিনশেড ঘরকে ঠেসে দ্বিতীয় বা তৃতীয় তলায় রূপ দেওয়া হয়েছে। একেক জায়গায় ৫-৭টি ঘর ব্যবহার করছে একটি মাত্র রান্নাঘর আর বাথরুম। এমন ঘিঞ্জি পরিবেশ যেখানে আগুন লাগা মানেই তা আর থামার সুযোগ পায় না।

বাসিন্দারা বলছেন, গ্যাস সিলিন্ডার এখানে ঘরে ঘরেই আছে। নিরাপত্তাহীন সিলিন্ডার, লিকেজ, পুরোনো রেগুলেটরের কারণে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ যেন রোজকার হুমকি। তার ওপর অবৈধ ঝুলন্ত বিদ্যুৎ লাইন, অতিরিক্ত লোড, নিম্নমানের তার- সব মিলিয়ে আগুন লাগা যেন সময়ের অপেক্ষা।

ফায়ার সার্ভিসের জন্যও এই বস্তির আগুন এক দুঃস্বপ্ন। সরু গলি, ভাঙাচোরা পথ, পানির উৎস না থাকা- সবকিছু মিলিয়ে প্রতি বারই আগুন নেভাতে গিয়ে পড়তে হয় ‍বিপাকে। বড় ট্রাক ঢুকতে পারে না, হোস পাইপ বারবার ফেটে যায়, আর আগুন দ্রুতই হাতছাড়া হয়ে যায়। গতকালও তারা এক কিলোমিটার দূর থেকে পানি এনে আগুন নেভাতে বাধ্য হয়েছে।

তবে আগুনের কারণ হিসেবে কেবল অসাবধানতা বা দুর্ঘটনাকেই দায়ী করছেন না অনেকে। বস্তির দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার পালাবদল- এসবকেই অনেক বাসিন্দা সন্দেহের চোখে দেখেন। বছর বছর উচ্ছেদ, পুনরায় বসতি, দখল- সব মিলিয়ে আগুনের পেছনে কোনো গোপন স্বার্থ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সাবেক ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারাও বলছেন, নাশকতার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই আগুন শুধু ঘর ভাঙে না- মানুষ ভাঙে। গার্মেন্টস কর্মী রুবিনা আক্তারের কণ্ঠে ছিল সেই ভাঙন, “বরিশালে বানের জলে সব হারাইছি। এখানে আইসিও আগুন ছাই করে দিছে। আর কত? আমরা ক্লান্ত।”
গিয়াস উদ্দিনের অভিজ্ঞতা আরও গভীর। তিনি তিনবার আগুনে সব হারিয়েছেন- ২০০৪, ২০১৭ এবং ২০২৫ সালে: “জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু আগুন। মরতে মরতে বেঁচেছি।”
মর্জিনা বেগমের কণ্ঠেও একই অসহায়তা- “এই প্রথম নিঃস্ব হইলাম না, কিন্তু এবার মনে হয় উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটাই আর রইলো না।”

স্কুলপড়ুয়া ইতি আক্তারের দুশ্চিন্তাও সরল কিন্তু নির্মম- পরীক্ষার আগেই বই-খাতা সব পুড়ে গেছে।

বস্তির বাসিন্দাদের প্রশ্ন- প্রতিবার আগুন লাগে, তদন্ত হয়, কারণও বলা হয়, কিন্তু আগুন কি থামে? না। আগুন যেন আরও নির্মম হয়ে ফিরে আসে। তাদের ক্ষতি কে পূরণ করবে?

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকও বলছেন, বস্তির অবস্থা এমন যে সেখানকার মানুষ সচেতন হলেও বাস্তবতা পরিবর্তন হয় না। এত মানুষকে এত কম জায়গায় রাখা- আগুন লাগলে তার ভয়াবহতা রোধের কোনো বাস্তব উপায় নেই।

এখন প্রয়োজন বাস্তবমুখী উদ্যোগ- সরু পথ প্রশস্ত করা, পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বস্তিজুড়ে ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করা, আর কড়াইলের জন্য আলাদা ফায়ার ইউনিট গঠন করা। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় আগুন নেভানো সম্ভব হলেও আগুন ঠেকানো সম্ভব নয়।

ঢাকার সবচেয়ে বড় বস্তি কড়াইল বারবার জ্বলে ওঠে, আবার ছাই থেকে উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন থাকে- আর কতবার? জীবনের কতটুকু আর পুড়লে তার ছাই থেকেই নতুন স্বপ্ন জন্মাবে?

 

বাংলাধারা/এসআর