ঢাকা, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

যুদ্ধ বন্ধে প্রথমবার এক টেবিলে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৪, ২০২৬, ১২:১২ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

ইউক্রেনে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের পর এই প্রথমবারের মতো যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একসঙ্গে আলোচনায় বসলো রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠক কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শান্তিচুক্তি নিয়ে বড় কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা আপাতত সীমিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, বৈঠকের ধরন ও কূটনৈতিক ভাষা কিছুটা বদলালেও যুদ্ধের মূল বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোতে পক্ষগুলোর অবস্থান এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।

এই আলোচনা এমন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ক্রমবর্ধমান চাপ প্রয়োগ করছেন। চলতি সপ্তাহেই তিনি মন্তব্য করেন, চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে উভয় পক্ষই ‘বোকা’র মতো আচরণ করবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দূতদের জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো অমীমাংসিত রেখেই আবুধাবিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউক্রেন এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে মূলত যুদ্ধ বন্ধের প্রবল আকাঙ্ক্ষা থেকে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে রাখার কৌশলগত প্রয়োজনের কারণেই।

এর আগে ট্রাম্পের এক মেয়াদে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে কিয়েভের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দাভোসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠককে ‘সত্যিকার অর্থেই ইতিবাচক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এর ফল হিসেবে তিনি রাশিয়ার লাগাতার হামলার বিপরীতে আরও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা পাওয়ার আশা করছেন। তবুও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হওয়া আলোচনার ফলাফল নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে সতর্ক অবস্থানই নিয়েছেন। বৈঠকটিকে তিনি শান্তির পথে একটি ‘পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করলেও একে সরাসরি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখাতে চাননি।

জেলেনস্কি দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, শান্তিচুক্তির পথে তারা প্রায় ৯০ শতাংশ এগিয়ে গেছেন। তবে শেষ ১০ শতাংশই সবচেয়ে কঠিন, কারণ এটি সরাসরি ভূখণ্ডের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল দনবাস নিয়ে রাশিয়া যে দাবি তুলেছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বাধা। মস্কো চায় দনবাস অঞ্চলের একটি বড় অংশ ইউক্রেন তাদের হাতে তুলে দিক, কিন্তু কিয়েভ তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউক্রেনীয় নেতৃত্বের মতে, এটি কোনো কূটনৈতিক রেড লাইন নয়, বরং সেনাদের রক্তের বিনিময়ে আঁকা সীমারেখা, যা জেলেনস্কির পক্ষে অতিক্রম করা রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব।

আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল- ভবিষ্যতে রাশিয়া যদি আবার ইউক্রেনে সামরিক হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবে। ইউক্রেন বলছে, এই ‘নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলেনস্কির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে, যদিও এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া কোনো নিশ্চয়তা আসলে কতটা নির্ভরযোগ্য। গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ নিয়ে তার অবস্থান ন্যাটো জোটকে দুর্বল করেছে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার যে নীতির ওপর ইউক্রেনে পশ্চিমা সহায়তা দাঁড়িয়ে আছে, তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবুও বর্তমান বাস্তবতায় কিয়েভের সামনে বিকল্প খুব সীমিত।

ভ্লাদিমির পুতিনের শান্তি-ইচ্ছা নিয়েও ইউক্রেনের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। দাভোসে জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে বলেছেন, পুতিন আসলে এই শান্তি চান না। ক্রেমলিনও জানিয়েছে, আলোচনার টেবিলে নিজেদের দাবি মেনে নেওয়া না হলে যুদ্ধক্ষেত্রেই তারা লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে। বিপুল সংখ্যক সেনা হারিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় রাশিয়া সম্প্রতি দেশজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামোতে আরও পরিকল্পিত ও ধ্বংসাত্মক হামলা বাড়িয়েছে। তীব্র শীতের মধ্যে এসব হামলায় ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে।

কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিটসকো সতর্ক করে বলেছেন, যাদের যাওয়ার মতো জায়গা আছে তারা যেন শহর ছেড়ে চলে যান। তার ভাষায়, শত্রুপক্ষ সম্ভবত রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা অব্যাহত রাখবে এবং বারবার আঘাতে শহরের ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে নাজুক হয়ে পড়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতি খুবই কঠিন এবং হয়তো সবচেয়ে কঠিন সময় এখনো সামনে রয়েছে।

এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তিন মার্কিন দূতের প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক হয়। সেখানে ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান ছাড়া টেকসই শান্তি সম্ভব নয় বলে সতর্ক করে দিয়েছে ক্রেমলিন। রাশিয়ার পক্ষ থেকে আলোচনায় ছিলেন ইউরি উশাকভ ও কিরিল দিমিত্রিভ, আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ, তার জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং নতুন মুখ হিসেবে ‘বোর্ড অব পিস’-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জশ গ্রুয়েনবাউম।

রাশিয়া আবারও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দনবাসের দাবি তারা ছাড়বে না এবং ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগদানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে। পাশাপাশি শান্তিচুক্তির পর ইউক্রেনের মাটিতে ন্যাটো সেনা মোতায়েনও তারা মেনে নেবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই সংঘাত আগামী ফেব্রুয়ারিতে পঞ্চম বছরে পা দিতে যাচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়লেও ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা- এই দুই প্রশ্নই এখনো শান্তির পথে সবচেয়ে বড় ও কঠিন বাধা হয়ে রয়ে গেছে।


বাংলাধারা/এসআর

নতুন কথা/এসআর