ঢাকা, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

ঢাকার অলিগলিতে নামে-বেনামে স্কুল, দেখেও না দেখার ভান সরকারের!

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৫, ২০২৬, ০৪:১৯ দুপুর  

ছবি: সংগৃহিত

ঢাকার অলিগলিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে নানা রঙের সাইনবোর্ড- প্রি-প্রাইমারি, কেজি স্কুল, ইংলিশ মিডিয়াম, কোথাও আবার স্কুল-মাদ্রাসা। সরু গলি, আবাসিক ভবনের নিচতলা, ভাড়া করা ফ্ল্যাট কিংবা অস্থায়ী কিছু কক্ষেই চলছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাইরে থেকে দেখলে এগুলোকে স্কুল বলেই মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভয়াবহ। খোলা ক্লাসরুম নেই, খেলাধুলার জায়গা নেই, নেই অগ্নিনিরাপত্তা বা জরুরি নির্গমন ব্যবস্থার মতো ন্যূনতম বিষয়ও। তবুও বছরের পর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু ভর্তি হচ্ছে, পড়াশোনা করছে, সময় কাটাচ্ছে- রাষ্ট্র যেন তা দেখেও দেখছে না।

শিশুদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো সুস্পষ্ট তদারকি চোখে পড়ে না। কে এসব স্কুল খুলছে, কী যোগ্যতায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, কীভাবে শিশুদের সঙ্গে আচরণ করা হচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোর কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। অনেক ক্ষেত্রেই সরকার জানে কি না, এসব স্কুলে আদৌ কী হচ্ছে, সেটিও অনিশ্চিত।

সম্প্রতি রাজধানীর নয়াপল্টনে শারমিন একাডেমি নামের একটি স্কুলে চার বছর বয়সী এক শিশুকে নির্মমভাবে মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলের একটি কক্ষের ভেতরে এক ব্যক্তি শিশুটিকে বেধড়ক মারধর করছেন, আর পাশে বসে থাকা এক নারী শিশুটির হাত ধরে রেখেছেন। কিছুক্ষণ পরপর শিশুটিকে আঘাত করা হচ্ছে, অথচ কেউ থামাচ্ছে না। পরে জানা যায়, মারধরকারী ব্যক্তি ওই স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার এবং পাশে থাকা নারী প্রধান শিক্ষক শারমিন আক্তার। মূলত দুজনই প্রতিষ্ঠানটির মালিক। ঘটনার তিন দিন পর পুলিশ পবিত্র কুমারকে গ্রেপ্তার করলেও এই ঘটনা ঢাকার অলিগলিতে গড়ে ওঠা স্কুলগুলোর ভয়ংকর বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে।

২২ জানুয়ারি সকালে নয়াপল্টনের ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শারমিন একাডেমির ভেতরে কোনো কার্যক্রম নেই। স্কুলটি তালাবদ্ধ। মাঝে মধ্যে দুই-একজন অভিভাবক বা কৌতূহলী মানুষ এসে ভেতরের দিকে তাকিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ভবনের কেয়ারটেকার কামরুল হক জানান, আগের দিন পর্যন্ত স্কুল খোলা ছিল, কিন্তু হঠাৎ কেন বন্ধ রাখা হয়েছে—সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। স্কুলের দেয়াল ও ব্যানারে থাকা নম্বরগুলোতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সব নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শারমিন একাডেমির মতো স্কুল ঢাকায় নতুন কিছু নয়। রাজধানীর আজিমপুর, পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় অলিগলির ভেতরে এমন অসংখ্য স্কুল রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি মাত্র ফ্ল্যাটে ৩০ থেকে ৪০ জন শিশুকে গাদাগাদি করে বসিয়ে পাঠদান চলছে। নেই খোলা জায়গা, নেই শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ, নেই জরুরি পরিস্থিতিতে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা। তবুও এসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে নির্বিঘ্নে চলছে। বেশিরভাগ অভিভাবকই জানেন না, এসব স্কুলের কোনো অনুমোদন আছে কি না, শিক্ষক নিয়োগের কোনো নীতিমালা আছে কি না বা শিশুরা সেখানে কতটা নিরাপদ।

আইন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০১১ সালে হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক শাস্তি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অসাংবিধানিক। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, শিশুকে নির্যাতন করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের নির্যাতনের ঘটনা ছিল ২১টি, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯-এ। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে ৪৭ এবং ২০২৪ সালে নেমে আসে ৩০-এ। তবে ২০২৫ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৯টি ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক অভিভাবকই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। মিরপুরের এক অভিভাবক নাঈমা মিতু বলেন, চাকরির কারণে বাধ্য হয়ে কাছাকাছি স্কুলেই সন্তানকে ভর্তি করাতে হয়, কিন্তু স্কুলের ভেতরে কী হচ্ছে, শিক্ষকরা কেমন আচরণ করেন—তা জানার কোনো উপায় নেই। শারমিন একাডেমির ভিডিও দেখে তিনি গভীরভাবে আতঙ্কিত। আরেক অভিভাবক শারমিন সুলতানা বলেন, সরকারি স্কুলে ভর্তি লটারির কারণে সুযোগ না পেয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো গলির ভেতরের স্কুলে ঠেলে যাচ্ছে। কোনো প্রশিক্ষণ বা মানদণ্ড ছাড়াই যারা শিশুদের পড়াচ্ছে, তাদের হাতেই সন্তানদের তুলে দিতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল জায়গা হলো তদারকির অভাব। প্রাইমারি বা কেজি স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় পড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত পরিদর্শন বা কার্যকর নজরদারি নেই। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। অনেক স্কুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং ট্রাস্ট, সোসাইটি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত। ফলে শিক্ষক নিয়োগ, শিশু সুরক্ষা বা আচরণবিধির মতো বিষয়গুলো কার্যত বাধ্যতামূলক থাকে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশে একটি পরিকল্পিত ও সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কোথায় কতগুলো প্রি-প্রাইমারি ও প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। ভর্তি ব্যবস্থায় লটারির ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ায় যারা সুযোগ পায় না, তারা কোথায় যাবে- এই প্রশ্নের কোনো কার্যকর সমাধান নেই। এই সুযোগেই পাড়া-মহল্লায় ব্যবসায়িক মানসিকতায় পরিচালিত কিন্ডারগার্টেন ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গড়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন, শিশুদের শিক্ষা মানে শুধু পড়ানো নয়; এর সঙ্গে কেয়ারিং ও নার্সিং গভীরভাবে যুক্ত। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও মানসিক প্রস্তুতি ছাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, কোনো শিশুকে শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতনের অধিকার কারও নেই এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। তিনি জানান, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিবন্ধনের জন্য সংশোধিত বিধিমালা ও নতুন সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে এবং চলতি বছর থেকেই মানদণ্ড পূরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে। তবে সরাসরি মনিটরিংয়ের দায়িত্ব মূলত মন্ত্রণালয়ের বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শিশুদের নিরাপত্তা যেখানে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, সেখানে ঢাকার অলিগলিতে বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে এসব স্কুল কীভাবে চলছে- সে প্রশ্ন এখন আরও জোরালো। একটি ভিডিও ভাইরাল না হলে কি এসব নির্যাতনের কথা সামনে আসত? শিশু কোনো পরীক্ষাগার নয়, তারা ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎকে অদক্ষ, অনিয়ন্ত্রিত ও বাণিজ্যিক হাতে তুলে দেওয়ার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই নিতে হবে- এই বাস্তবতা অস্বীকার করার আর সুযোগ নেই।

 


বাংলাধারা/এসআর