কঠোর হচ্ছে সম্প্রচার আইন:
গোপন তথ্য প্রচার ও জুয়ার বিজ্ঞাপনে জেল, লাইসেন্স ছাড়া চলবে না টিভি-ওটিটি
প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৯, ২০২৬, ১০:৪৮ দুপুর
ফাইল ছবি
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনস্বার্থ ও সম্প্রচার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর আইন আনতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ‘সম্প্রচার অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে, যেখানে গোপন সামরিক ও বেসামরিক তথ্য প্রচার, জুয়া ও প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে লাইসেন্স ছাড়া টেলিভিশন, রেডিও কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) মন্ত্রণালয় থেকে খসড়াটি সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে এবং ৩১ জানুয়ারির মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েই এই অধ্যাদেশ জারি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, আইন কার্যকর হলে সরকার একটি স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন গঠন করবে। এই কমিশন গঠনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বাছাই কমিটি থাকবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। কমিটিতে সম্প্রচার খাতে কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুইজন বিশেষজ্ঞ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং একজন অতিরিক্ত সচিব সদস্য হিসেবে থাকবেন। প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুইজন করে যোগ্য প্রার্থীর নাম সরকারের কাছে সুপারিশ করা হবে। সরকার সর্বোচ্চ চার বছরের জন্য একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেবে এবং পাঁচ সদস্যের এই কমিশনে অন্তত একজন নারী কমিশনার রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন এই সম্প্রচার কমিশনের মূল দায়িত্ব হবে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি সম্প্রচার কার্যক্রমকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে আনা এবং তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল প্রবাহ নিশ্চিত করা। কমিশন প্রয়োজনীয় নীতিমালা, আচরণবিধি ও সম্প্রচার নির্দেশিকা প্রণয়ন করবে এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন তদারকি করবে। কোনো সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান নীতিমালা লঙ্ঘন করলে কমিশন জরিমানা আরোপ, সংশোধনী প্রচারের নির্দেশ, সাময়িকভাবে সম্প্রচার স্থগিত কিংবা চূড়ান্তভাবে লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবে। কারিগরি বিষয়গুলোতে কমিশন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করবে এবং দুই সংস্থার মধ্যে নিয়মিত বৈঠকের বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনে দর্শক-শ্রোতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক বিরোধ মীমাংসার ক্ষমতাও কমিশনের হাতে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে কমিশন সরেজমিনে গিয়ে যে কোনো সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় পরিদর্শন করতে পারবে এবং তদন্তের স্বার্থে ডিজিটাল প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করতে পারবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি সার্বজনীন রেটিং ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে এবং সম্প্রচার খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সহায়তা করবে কমিশন।
খসড়া অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর সরকারের কাছ থেকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া কোনো ধরনের সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। টেরিস্ট্রিয়াল ও স্যাটেলাইট টিভি-রেডিও, ক্যাবল টিভি, আইপি টিভি ও রেডিও, ডিটিএইচ, এফএম ও কমিউনিটি রেডিওর পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, স্ট্রিমিং সার্ভিস ও ভিডিও-অন-ডিমান্ড কার্যক্রমও লাইসেন্সের আওতায় আনা হচ্ছে। আগে অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত লাইসেন্সপ্রাপ্ত বলে গণ্য হবে, তবে নতুনদের নির্ধারিত ফি দিয়ে আবেদন করতে হবে এবং যাচাই-বাছাই শেষে কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার লাইসেন্স দেবে।
লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ, অশ্লীল বা মিথ্যা তথ্য প্রচার, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বা আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টকারী কনটেন্ট, জঙ্গিবাদ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ তথ্য প্রচার করলে কমিশন সর্বোচ্চ ১৪ দিনের জন্য লাইসেন্স স্থগিত করতে পারবে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হবে। একই সঙ্গে গোপন সামরিক বা বেসামরিক তথ্য প্রচার করলে সংশ্লিষ্টদের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। জুয়া, বাজি, প্রতারণামূলক বা অনুমোদনহীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার করলে বিজ্ঞাপনদাতা ও সম্প্রচার সংশ্লিষ্ট সবাইকে কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। এছাড়া জাতীয় সংসদ ভবন, সচিবালয়, আদালত, সেনানিবাসসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করলেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনে সম্প্রচার আইন লঙ্ঘনের বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ সম্প্রচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকবে এবং রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (সম্প্রচার) মো. আলতাফ হোসেন বলেন, সম্প্রচার অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করে সংশ্লিষ্টদের মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাধারা/এসআর
