ঢাকা, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য থেকে শিক্ষা: সাহস, দেশপ্রেম ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানসিক দৃঢ়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৬, ২০২৬, ০২:২৯ দুপুর  

ফাইল ছবি

বাংলা রেনেসাঁর উজ্জ্বল প্রতিভা মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মধুসূদন দত্ত কাব্য, নাটক, প্রহসন, পত্রকাব্য ও সনেটের মতো বিভিন্ন সাহিত্যশাখায় অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। তার মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃত।

মেঘনাদবধ কাব্য শুধু কাব্যিক উৎকর্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং ইতিহাস ও সামাজিক বার্তার কারণে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মূলত ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে মধুসূদন এই কাব্য রচনা করেন। এটি একটি রূপক মহাকাব্য, যেখানে অমৃতাক্ষর ছন্দের মাধ্যমে দেশপ্রেম, বীরত্ব ও নৈতিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।

কাব্যের কাহিনীতে রামায়ণের মাত্র তিনদিনের যুদ্ধ ঘটনাকে কেন্দ্র করলেও তাৎপর্য বহুমাত্রিক। এখানে রাম, লক্ষণ ও ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটিশ শাসক ও দখলদার শক্তির প্রতীক। অন্যদিকে রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদ (ইন্দ্রজিৎ) দেশের জন্য লড়াইরত দেশপ্রেমিকদের প্রতীক। মধুসূদন দত্ত জন মিল্টনের প্যারাডাইস লস্ট, হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসি এবং ড্যান্ডি’র ডিজাইন কমেডি থেকে প্রভাবিত হয়ে কাব্য রচনা করেছেন।

কাব্যে দেখা যায়, স্বর্গে রাম ও লক্ষণের আক্রমণে রাবণের পুত্র বীরবাহু নিহত হয়। রাবণ অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করে। পিতার বিপদে মেঘনাদ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নাম মেঘনাদ, কারণ সে মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করত। কিন্তু মুখোমুখি যুদ্ধে তাকে পরাজিত করা অসম্ভব, তাই রাম ও লক্ষণ বিভীষণকে প্ররোচিত করে মেঘনাদকে হত্যা করানোর চক্রান্ত চালায়।

অবশেষে, নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে নিরস্ত্র অবস্থায় ইষ্ট দেবীকে তুষ্ট করার সময় লক্ষণ পেছন থেকে মেঘনাদকে হত্যা করে। এ ঘটনা কাব্যে কাপুরুষতার নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রাবণ মেঘনাদের মৃত্যুর পর অত্যন্ত কষ্টে তার লাশ চিতায় পুড়িয়ে দেন, এবং মেঘনাদের স্ত্রী প্রমীলা সহমরণ গ্রহণ করেন।

মধুসূদন দত্ত এখানে দেখিয়েছেন যে, পরাশক্তি মানবিকতার মুখে ন্যায়বিচার দেখায় বলে দাবি করলেও বাস্তবে তাদের নিজস্ব স্বার্থ প্রাধান্য পায়। দেশপ্রেম ও সাহসী সংগ্রাম পরাশক্তির চক্রান্তে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়।

কাব্যের বার্তা আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের বাস্তবতা এই শিক্ষা আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তির প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার জাতীয়তাবাদ, মানুষের মুক্তির সংগ্রাম ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যুগে যুগে ঐক্যবদ্ধ থেকেছে। সাহস, দেশপ্রেম এবং একতার মূল্যবোধ মধুসূদনের কাব্য থেকে আজও আমাদের শেখার মতো।


বাংলাধারা/এসআর