প্রধান উপদেষ্টা: এবারের নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে
প্রকাশিত: জানুয়ারী ২১, ২০২৬, ০৬:০৮ বিকাল
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়। সভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। এটি জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে পারলে নির্বাচনটি দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি সবাইকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেন, যাতে নির্বাচনের দিন কোথাও কোনো ঘাটতি বা বিভ্রাট না থাকে। ড. ইউনূস বলেন, আজ থেকেই প্রস্তুতির ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হয়েছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি হবে এই পরীক্ষার চূড়ান্ত দিন। ২০২৬ সালের নির্বাচন যেন ভবিষ্যতের জন্য একটি আদর্শ নির্বাচন হয়ে ওঠে, সেটিই সরকারের লক্ষ্য।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাই সর্বোচ্চ নির্দেশ। ইসির নির্দেশনা মেনে সব বাহিনী ও সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে। তিনি জানান, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমান্ডের মূল ভূমিকায় থাকবে এবং এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বডি ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করা হবে। বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কোনো ঘাটতি যেন না থাকে, সেদিকেও কঠোর নজর দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
ড. ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচন দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকের নজরে রয়েছে। তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে, তাই সরকারের পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রস্তুতি বিবেচনায় একটি শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও সুন্দর নির্বাচন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রয়েছে এবং আশা করা যায়, তারা এই অবস্থান থেকে সরে যাবেন না।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসতে পারে। ইতোমধ্যে তাদের ৫৬ জন প্রতিনিধি দেশে অবস্থান করছেন এবং মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত আপিল প্রক্রিয়াও তারা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি আরও জানান, আজ মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন।
ইসি সচিব জানান, সাইবার স্পেসে অপতথ্য ও তথ্য বিকৃতি এবারের নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট এবং পোস্টাল ব্যালট একসঙ্গে গণনা করতে বাড়তি সময় লাগবে। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে যেন কোনো গুজব বা বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে, সেজন্য গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।
সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং এতে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া যাবে।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে, যাতে কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড ঘটতে না পারে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবেন।
স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি বলেন, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে মাঠপর্যায়ে বডি ক্যামেরা পৌঁছে যাবে এবং ভোটের চার দিন আগে থেকে সব বাহিনী মোতায়েন করা হবে। ভোটের পর আরও সাত দিন তারা মাঠে দায়িত্ব পালন করবে। বডি ক্যামেরার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি মনিটরিং ও সব ঘটনা রেকর্ড করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বডি ক্যামেরা যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সাফল্য পাওয়া যাবে। তিনি জানান, নির্বাচন পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে এবং প্রয়োজনে আরও ঘন ঘন এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাধারা/এসআর
