ঢাকা, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় মিয়ানমারের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: জানুয়ারী ২৩, ২০২৬, ০৯:৪৫ রাত  

ছবি: সংগৃহিত

রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় মিয়ানমারের সাম্প্রতিক উপস্থাপনাকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। মিয়ানমারের বক্তব্যকে ইতিহাস বিকৃতি ও দায় এড়ানোর অপচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ঢাকা।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগের কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, আইসিজেতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে ২০১৬-১৭ সালে রাখাইনে সংঘটিত ভয়াবহ ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ ও গণহত্যার দায় এড়ানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করে বাংলাদেশ।

বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট করে জানায়, রোহিঙ্গারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরাকান অঞ্চলে বসবাসরত একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী। ‘রোহাং’ বা ‘রোশাং’ নাম থেকেই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের উৎপত্তি, যা সময়ের সঙ্গে তাদের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও সামাজিক রীতিনীতিতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে রাখাইনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং স্বাধীনতা-পূর্ব বার্মার রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতেও তাদের উপস্থিতি সুস্পষ্ট ছিল।

বাংলাদেশের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বাদ দেয়। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে তারা সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬-১৭ সালে রাখাইন থেকে জোরপূর্বক বিতাড়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের কার্যত রাষ্ট্রহীন করে তোলা হয়।

বাংলাদেশ সরকার জানায়, রোহিঙ্গা ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার কিছু সাদৃশ্য থাকলেও এটি কোনোভাবেই বাংলা ভাষার অংশ নয়। রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করা তাদের আত্মপরিচয় অস্বীকার করার পাশাপাশি জাতিগত নির্মূল প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

বিবৃতিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ১৯৭৮ সালের দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন চুক্তিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘আইনসম্মত বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তাদের সমান অধিকারসহ সমাজে অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে গত আট বছর ধরে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি দেশটি। ২০১৭-১৮ সালের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পরও নানা অজুহাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হচ্ছে, যা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ।

এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকার ২০২৩ সালের ৬ জুলাই মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দেওয়া এক কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে উত্থাপিত দাবিরও তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ওই ব্রিফিংয়ে দাবি করা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের ‘অর্ধ-মিলিয়ন বাঙালি’ রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার জানায়, সে সময় রাখাইনের মোট জনসংখ্যাই ছিল ১৭ লাখের কম। এত বড় শরণার্থী প্রবাহ হলে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হতো এবং পরবর্তী আদমশুমারিতেও তার প্রমাণ মিলত- যা বাস্তবে পাওয়া যায়নি।

বিবৃতির শেষাংশে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার ও রাখাইনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানায়, রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত না করে আন্তরিকভাবে সমস্যার টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত সমাধানের পথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।


বাংলাধারা/এসআর